বিয়ের খুতবা পড়ার নিয়ম: খুতবাতুল হাজাহ আরবি, বাংলা অর্থ ও পূর্ণ ব্যাখ্যা

Last Updated on February 4, 2026 by Protik

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বিবাহকে একটি শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি বা ‘মিছাকান গালিজা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি হলো এই যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রূম: ২১)। এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, বিবাহের মূল ভিত্তি হলো মানসিক প্রশান্তি এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া ভালোবাসা ও দয়া। কুরআন বিবাহকে নারী ও পুরুষের জন্য একটি চারিত্রিক আবরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বিবাহের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। এক হাদিসে তিনি ইরশাদ করেন, “বিবাহ আমার সুন্নাত; সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অনুযায়ী আমল করে না, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (ইবনে মাজাহ)। রাসূল (সা.) আরও বলেছেন, যখন কোনো বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করে; সুতরাং বাকি অর্ধেকের জন্য যেন সে আল্লাহকে ভয় করে। ইসলামে বিবাহ কোনো বৈরাগ্যবাদ নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও পবিত্র জীবন যাপনের নাম।

Table of Contents

 বিয়ের খুতবা কী?

‘খুতবা’ শব্দের অর্থ: আরবি ‘খুতবা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ভাষণ, বক্তৃতা বা সম্বোধন। ইসলামি পরিভাষায়, কোনো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি সমাবেশ বা অনুষ্ঠানের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও নসিহত সম্বলিত যে বক্তব্য দেওয়া হয়, তাকেই খুতবা বলা হয়।

নিকাহের খুতবার উদ্দেশ্য: বিবাহের খুতবা দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা এবং উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে বিবাহের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা। এটি বিবাহের মজলিশে একটি আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য তৈরি করে। খুতবার মাধ্যমে নবদম্পতিকে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া সম্পর্কে সচেতন করা হয়। এটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি ইবাদতের ভূমিকা।

“খুতবাতুল হাজাহ” নামকরণের কারণ: বিবাহের খুতবাকে ‘খুতবাতুল হাজাহ’ বলা হয়। ‘হাজাহ’ শব্দের অর্থ হলো প্রয়োজন। জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন বা শুভ কাজের সূচনায় রাসূল (সা.) এই নির্দিষ্ট ভাষণটি পাঠ করতেন বলে একে ‘প্রয়োজনের খুতবা’ বা ‘খুতবাতুল হাজাহ’ বলা হয়। এটি বিবাহের ইজাব ও কবুলের মতো বৃহৎ প্রয়োজনের সময় পাঠ করা অত্যন্ত বরকতময়।

বিয়ের খুতবার শরীয় ভিত্তি

রাসূল (সা.)-এর আমল: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে যখন বিবাহ করেছেন অথবা কোনো সাহাবীর বিবাহ পড়িয়েছেন, তখন তিনি সর্বদা খুতবা পাঠ করতেন। এটি তাঁর নিয়মিত আমলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিরাত ও হাদিসের কিতাবগুলোতে রাসূল (সা.)-এর বিবাহের খুতবা প্রদানের অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায়।

হাদিসের প্রমাণ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের ‘খুতবাতুল হাজাহ’ শিক্ষা দিয়েছেন যা বিবাহের সময় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে পাঠ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি)। এই হাদিসটি বিবাহের খুতবা প্রদানের জন্য সবচেয়ে বড় শরয়ি দলিল। সাহাবায়ে কেরামও এই নিয়ম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করতেন।

ফরজ না সুন্নাহ—ফিকহি ব্যাখ্যা: ফিকহশাস্ত্রবিদদের মতে, বিবাহের খুতবা পাঠ করা ‘সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ’ বা অতি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। যদি কোনো বিবাহে খুতবা পাঠ করা না হয়, তবুও বিবাহ সহীহ হয়ে যাবে যদি ইজাব, কবুল ও সাক্ষী বিদ্যমান থাকে। তবে খুতবা ছাড়া বিবাহ করা সুন্নাতের বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার শামিল। ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতে এটি একটি মুস্তাহাব ও অতি উত্তম কাজ।

বিয়ের খুতবা ও দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

বিবাহের আসরে যে খুতবাটি পাঠ করা হয় তা মূলত আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসূলের রিসালাতের স্বীকৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি বিবাহপ্রার্থী এবং উপস্থিত সকলের হৃদয়ে খোদাভীতি জাগ্রত করার এক চমৎকার মাধ্যম।

 বিয়ের খুতবা – আরবি মূল পাঠ

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ.

 বিয়ের খুতবা আরবি উচ্চারণ

Innal hamda lillahi nahmaduhu wa nasta’inuhu wa nastaghfiruhu, wa na’udhu billahi min shururi anfusina wa min sayyiati a’malina. May-yahdihillahu fala mudilla lah, wa may-yudlil fala hadiya lah. Wa ash-hadu al-la ilaha illallahu wahdahu la sharika lah, wa ash-hadu anna Muhammadan abduhu wa rasuluh.

biyer khudba bangla ortho soho

আরবি উচ্চারণ যেভাবে করবেন

খুতবাতুল হাজাহ সঠিকভাবে পাঠ করার জন্য শুদ্ধ উচ্চারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আরবি ভাষায় উচ্চারণের সামান্য পরিবর্তনেও অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নিকাহের মতো পবিত্র ইবাদতের সূচনায় খুতবা পাঠের সময় শব্দগুলোর মাখরাজ (উচ্চারণের স্থান) ও দীর্ঘ-হ্রস্ব ধ্বনির প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।

উচ্চারণের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে—

  • “نستعينه” (নাস্তা’ঈনুহু) শব্দে ‘ঈন’ অংশটি হালকা টেনে পড়তে হবে।
  • “نعوذ” (না‘উযু) শব্দে ‘উয’ ধ্বনিটি গভীরভাবে উচ্চারণ করতে হবে।
  • “لا إله إلا الله” অংশে ‘লা’ দীর্ঘ করে এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ স্পষ্টভাবে পড়া জরুরি।
  • “مُضِلَّ”“هَادِيَ” শব্দে শাদ্দা ও দীর্ঘ স্বরের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।

সঠিক আরবি উচ্চারণ শিখে নেওয়ার মাধ্যমে খুতবার মর্যাদা রক্ষা হয় এবং আল্লাহর নিকট ইবাদতটি অধিক গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশা করা যায়।

বিয়ের খুতবা বাংলা উচ্চারণ

ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নাস্তাইনুহু ওয়া নাস্তাগফিরুহু, ওয়া নাউযুবিল্লাহি মিন শুরুরি আনফুসিনা ওয়া মিন সাইয়িআতি আমালিনা। মাই ইয়াহদিহিল্লাহু ফালা মুদিল্লা লাহ, ওয়া মাই ইয়ুদলিল ফালা হাদিয়া লাহ। ওয়া আশহাদু আল-লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।

বিবাহের খুতবা বাংলা উচ্চারণ যেভাবে করবেন

যাঁরা আরবি ভাষায় দক্ষ নন, তাঁদের জন্য বাংলা হরফে উচ্চারণ একটি বড় সহায়ক। তবে বাংলা উচ্চারণ লেখার সময় শব্দগুলোর মূল আরবি ধ্বনি যেন বিকৃত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

বাংলা উচ্চারণ পড়ার সময় কিছু বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—

  • “ইন্নাল হামদা লিল্লাহি” অংশে হামদা শব্দটি জোর দিয়ে পড়তে হবে।
  • “নাস্তাগফিরুহু” শব্দে গফি অংশটি স্পষ্ট উচ্চারণ করতে হবে।
  • “ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান” অংশে মুহাম্মাদান শব্দে ‘দ’ নয়, ‘দাল’ ধ্বনি বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে।

বাংলা উচ্চারণের উদ্দেশ্য হলো—যেন সাধারণ মুসলিমরাও অর্থ বুঝে, মনোযোগ সহকারে খুতবাটি পাঠ বা অনুসরণ করতে পারেন। তবে সুযোগ থাকলে আরবি উচ্চারণ সংশোধনের জন্য আলেম বা ক্বারীর সহায়তা নেওয়া উত্তম।

বিয়ের খুতবা বাংলা অর্থ

নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের নফসের (কুপ্রবৃত্তি) অনিষ্টতা এবং আমাদের মন্দ কাজগুলো থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি একক এবং তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।

পূর্ণ ব্যাখ্যা

খুতবাতুল হাজাহ-এর বাংলা অর্থ কেবল একটি অনুবাদ নয়; এটি দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক নির্দেশনা।

  • “সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য”
    এর মাধ্যমে বুঝানো হয়—বিবাহের সফলতা, শান্তি ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে।
  • “আমরা তাঁরই সাহায্য চাই”
    দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সংকট ও সিদ্ধান্তে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেউ সফল হতে পারে না।
  • “নফসের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাই”
    এটি দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অহংকার, রাগ, সন্দেহ ও আত্মকেন্দ্রিকতা থেকেই অধিকাংশ দাম্পত্য কলহের জন্ম হয়।
  • “যাকে আল্লাহ পথ দেখান, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না”
    স্বামী-স্ত্রী যদি আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেন, তবে বাইরের কোনো ষড়যন্ত্র তাদের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে না।
  • তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য
    এর মাধ্যমে বিবাহকে একটি নিছক সামাজিক চুক্তি নয়, বরং ঈমানভিত্তিক বন্ধনে পরিণত করা হয়।

এই অর্থগুলো দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি স্তরে আল্লাহভীতির উপস্থিতি নিশ্চিত করে।

 খুতবাতুল হাজাহ – সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

খুতবাতুল হাজাহ মূলত আত্মশুদ্ধি ও দায়িত্ববোধের ঘোষণা। বিবাহের শুরুতেই নফসের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাওয়ার অর্থ হলো—স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই যেন নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর সাহায্যের ওপর নির্ভর করে।

এই খুতবার মাধ্যমে তিনটি মৌলিক বার্তা দেওয়া হয়—

  1. তাকওয়া: দাম্পত্য জীবনে আল্লাহকে ভয় করে চলাই স্থায়ী শান্তির চাবিকাঠি।
  2. তাওহিদ: সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে আল্লাহ, ব্যক্তিস্বার্থ নয়।
  3. আনুগত্য: আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বরকতময় হয় না।

বিয়েতে এই খুতবা পড়ার উদ্দেশ্য হলো—যেন নতুন জীবনের শুরু হয় আল্লাহর নাম ও স্মরণের মাধ্যমে। এতে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং দাম্পত্য সম্পর্ক একটি ইবাদতের রূপ ধারণ করে।

বিয়ের খুতবায় পড়া কুরআনের আয়াতসমূহ

নবী করিম (সাঃ) সাধারণত খুতবাতুল হাজাহ পাঠের পর নবদম্পতিকে তাকওয়ার নির্দেশ দিতে এবং বিবাহের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে কুরআনের কয়েকটি নির্দিষ্ট আয়াত পাঠ করতেন। এসব আয়াত দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহভীতি, সত্যবাদিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা প্রদান করে।

বিয়ের খুতবা

সূরা আন-নিসা

আয়াত ১:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا

বাংলা অর্থ:
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের উভয় থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবি করো এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।

সূরা আল-আহযাব

আয়াত ৭০–৭১:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا

বাংলা অর্থ:
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সত্য কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের কর্মসমূহ সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহাসাফল্য অর্জন করল।

সূরা আলে ইমরান

আয়াত ১০২:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

বাংলা অর্থ:
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে যেন তোমাদের মৃত্যু না আসে।

বিয়ের খুতবা কখন, কোথায় ও কীভাবে পড়া হয়

নিকাহের আগে কেন পড়া হয়: নিকাহ বা ইজাব-কবুল সম্পন্ন হওয়ার ঠিক আগে খুতবা পড়া সুন্নাত। এটি বিবাহের মূল চুক্তির প্রস্তাবনা হিসেবে কাজ করে। খুতবার নসিহত শোনার পর বর ও সাক্ষীদের মন আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট হয়, ফলে পবিত্র মনে বিবাহের সাক্ষ্য ও কবুল সম্পন্ন হয়।

কে পড়বেন: সাধারণত বিবাহের কাজী বা মজলিশের ইমাম সাহেব খুতবা পাঠ করেন। তবে বর যদি নিজে খুতবা পড়তে সক্ষম হন, তবে তার জন্য খুতবা পাঠ করা উত্তম। অভিভাবক বা অন্য কোনো দ্বীনদার ব্যক্তিও এটি পাঠ করতে পারেন।

কোথায় পড়া উত্তম: বিবাহের মজলিশ মসজিদে হওয়া উত্তম। রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমরা বিবাহের বিষয়টি ঘোষণা করো এবং তা মসজিদে সম্পন্ন করো।” তবে ঘরোয়াভাবে বা কোনো কমিউনিটি সেন্টারে হলেও সেখানে খুতবা পাঠ করা আবশ্যিক সুন্নাহ।

আদব ও শালীনতা: খুতবার সময় উপস্থিত সবাইকে চুপ থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতে হয়। এটি একটি ধর্মীয় ভাষণ, তাই এর সময় কোনো প্রকার হাসি-ঠাট্টা বা হৈচৈ করা আদব পরিপন্থী। খুতবা পাঠকারীকে অবশ্যই মার্জিত পোশাকে এবং পবিত্র অবস্থায় থাকতে হবে।

বিয়ের খুতবার দোয়া

ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার পর রাসূল (সা.) নবদম্পতির জন্য একটি বিশেষ দোয়া পড়তেন।

দোয়ার আরবি: بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ.

বাংলা উচ্চারণ: বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামা’আ বাইনাকুমা ফী খাইর।

বাংলা অর্থ: আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন, তোমার ওপর বরকত নাযিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সাথে একত্রিত রাখুন।

দাম্পত্য জীবনের শিক্ষা: এই দোয়ার মাধ্যমে কেবল প্রাচুর্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক বরকত কামনা করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে যেন সর্বদা কল্যাণ ও বরকত থাকে এবং কোনো অশুভ শক্তি যেন বিচ্ছেদ ঘটাতে না পারে, এই দোয়ায় সেই আবেদনই করা হয়। এটি প্রতিটি নবদম্পতির জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার।

বাসর রাতে স্ত্রীর জন্য দোয়া

বাসর রাতে স্বামী যখন স্ত্রীর মাথায় হাত রেখে দোয়া করবে, তখন এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত:

আরবি:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ

বাংলা উচ্চারণ:

আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।

অর্থ:

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ এবং আপনি তাকে যে স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর আমি আপনার কাছে তার অনিষ্ট এবং আপনি তাকে যে স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইছি।” (আবু দাউদ)

বিয়ের খুতবার ফজিলত ও উপকারিতা

খুতবা

সুন্নাহ পালনের সওয়াব: খুতবা পাঠের মাধ্যমে একটি সুন্নাহ জীবিত হয়। রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণে যে কাজ শুরু হয়, তার সওয়াব অতুলনীয়। এর মাধ্যমে বিবাহের মজলিশে ফেরেশতাদের রহমত বর্ষিত হয়।

নবদম্পতির জীবনে প্রভাব: খুতবায় পঠিত কুরআনের আয়াতগুলো নবদম্পতির মনে সারা জীবন রেখাপাত করে। বিশেষ করে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়ের নসিহত তাদের কঠিন সময়ে ভুল পথ থেকে দূরে রাখে। এটি একটি নৈতিক গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে।

পারিবারিক শান্তি: যেই পরিবারের ভিত্তি আল্লাহর নাম ও তাঁর কালামের মাধ্যমে হয়, সেই পরিবারে শান্তি ও স্থিতি বজায় থাকে। খুতবার শিক্ষাগুলো মেনে চললে পারিবারিক কলহ দূর হয় এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

বিয়ের খুতবা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

১. খুতবা না পড়লে বিয়ে হবে না ❌ এটি একটি ভুল ধারণা। খুতবা পড়া সুন্নাত। ইজাব ও কবুল হয়ে গেলে বিবাহ হয়ে যায়। তবে সুন্নাহর বরকত পেতে খুতবা পড়া জরুরি।

২. শুধু আরবিতে পড়তে হবে ❌ খুতবার মূল শব্দগুলো আরবিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়, তবে উপস্থিত মজলিশ যদি আরবি না বোঝে, তবে খুতবার বিষয়বস্তু এবং কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা স্থানীয় ভাষায় (যেমন বাংলা) বুঝিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর ও উত্তম।

৩. শুধু মসজিদে পড়া যাবে ❌ মসজিদে বিবাহ করা সুন্নাত, তবে বাড়ির উঠোনে বা অন্য কোনো শালীন স্থানে খুতবা পাঠ করে বিবাহ সম্পন্ন করলে তা মোটেও অশুদ্ধ হবে না। স্থান যাই হোক, খুতবার মর্যাদা একই।

শেষ কথা 

পরিশেষে বলা যায়, বিবাহের খুতবা কেবল কতগুলো আরব্য বাক্যের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি পবিত্র জীবনের দিকনির্দেশনা। এটি পাঠের মাধ্যমে একটি নতুন পরিবারের যাত্রা শুরু হয় আল্লাহর মহিমা ঘোষণার মাধ্যমে। খুতবাতুল হাজাহ এবং তাতে পঠিত কুরআনের আয়াতগুলো আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের মূলনীতি স্মরণ করিয়ে দেয়। নবদম্পতির উচিত খুতবায় পঠিত তাকওয়া, সত্যবাদিতা এবং আল্লাহর আনুগত্যের পাঠকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আঁকড়ে ধরা। তবেই আমাদের সমাজ ও পরিবারগুলো প্রশান্তির নীড়ে পরিণত হবে।

 বিয়ের খুতবা সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

১. বিয়ের খুতবা কি দীর্ঘ হওয়া উচিত? 

না, রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ হলো সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ খুতবা দেওয়া। অতিরিক্ত দীর্ঘ খুতবা অনেক সময় উপস্থিতিদের জন্য বিরক্তির কারণ হতে পারে।

২. খুতবার সময় বর ও কনেকে কি সামনাসামনি থাকতে হয়?

 খুতবার সময় বর মজলিশে উপস্থিত থাকা জরুরি। কনে সাধারণত পর্দার আড়ালে থেকে খুতবা শোনেন। এটিই ইসলামী শালীনতা।

৩. খুতবা চলাকালীন কথা বলা কি জায়েজ? 

না, খুতবা চলাকালীন কথা বলা মাকরুহ। এটি জুমার খুতবার মতো মনোযোগ দিয়ে শোনা সুন্নাত।

৪. খুতবাতুল হাজাহ অন্য কোনো সময় পড়া যায়?

 হ্যাঁ, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি সমাবেশ বা দ্বীনি আলোচনার শুরুতে এটি পাঠ করা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত।

৫. আরবি না জানলে কি খুতবা দেওয়া যাবে?

 খুতবার মূল অংশগুলো মুখস্থ করে বা দেখে পড়া যায়। তবে এর অর্থ ও নসিহত মাতৃভাষায় আলোচনা করা উচিত।

৬. খুতবার পর কি খোরমা বা মিষ্টি বিতরণ করা জরুরি? 

মিষ্টি বা খোরমা বিতরণ করা একটি সামাজিক প্রচলন এবং রাসূল (সা.) থেকে খোরমা বিতরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। এটি বিবাহের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, তবে খুতবার অংশ নয়।

৭. খুতবা কি কেবল পুরুষরাই শুনতে পারে?

না, খুতবা নারী-পুরুষ সকলের জন্যই নসিহত। নারীরা পর্দার আড়ালে থেকে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনতে পারেন।

৮. খুতবা পাঠকারীর কি ওযু থাকা বাধ্যতামূলক?

ওযু থাকা সুন্নাত ও আদব। তবে ওযু ছাড়া খুতবা পড়লে খুতবা হয়ে যাবে, কিন্তু এটি অনুত্তম।

৯. বিবাহের খুতবা কি রেকর্ডিং প্লে করা যাবে?

না, খুতবা সশরীরে উপস্থিত থেকে পাঠ করা সুন্নাত। রেকর্ডিং বাজানো সুন্নাহ আদায়ের জন্য যথেষ্ট নয়।

১০. খুতবার সময় কি টুপি পরা জরুরি? 

টুপি পরা একটি ইসলামি শিষ্টাচার। ধর্মীয় পরিবেশে টুপি বা মাথা ঢেকে রাখা সুন্নাহ সম্মত আদব।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

As you found this post useful...

Follow us on social media!

We are sorry that this post was not useful for you!

Let us improve this post!

Tell us how we can improve this post?

Leave a Comment