দরুদে ইব্রাহিম বাংলা অর্থ – সহীহ পাঠ ও নামাজে পড়ার বিধান

Last Updated on February 4, 2026 by Protik

দরুদে ইব্রাহিম বাংলা অর্থ: ইসলামি শরিয়তে দরুদ শরীফ একটি অনন্য ইবাদত। এটি এমন এক আমল যা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর ফেরেশতাগণ সম্পাদন করেন। সকল দরুদের মধ্যে ‘দরুদে ইব্রাহিম’ হলো সর্বাধিক বিশুদ্ধ এবং মর্যাদাপূর্ণ। কারণ এটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবীদের শিক্ষা দিয়েছেন। নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর এটি পাঠ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ এবং অনেক ইমামের মতে ওয়াজিব। এই দরুদ পাঠের মাধ্যমে মুমিন বান্দা আল্লাহর দরবারে রহমত ও বরকতের আরজি পেশ করে। নবীজী (সা.)-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এটি এক ঐশী পদ্ধতি, যা বান্দার আত্মিক প্রশান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করে।

Table of Contents

দরুদ কী ?

‘দরুদ’ শব্দটি মূলত ফারসি থেকে এসেছে, যার আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘আস-সালাত’। এর অর্থ হলো রহমত, দোয়া ও শুভকামনা। ইসলামি পরিভাষায়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষণের জন্য যে দোয়া করা হয়, তাকেই দরুদ বলা হয়। ইসলামে দরুদের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনের সূরা আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং মুমিনদেরও দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন।

দরুদ পাঠ কেবল একটি জিকির নয়, এটি দোয়া কবুলের অন্যতম চাবিকাঠি। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করেন, তার দশটি গোনাহ মাফ করেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বাড়িয়ে দেন। যে দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ নেই, সেই দোয়া আসমানে ঝুলে থাকে—তা কবুল হয় না।

দরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দার সাথে রাসূল (সা.)-এর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক গভীর হয়। এটি কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.)-এর শাফায়াত লাভের প্রধান ওসিলা। দরুদবিহীন জীবন বরকতহীন, কারণ এটি নবীর প্রতি উম্মতের কৃতজ্ঞতার প্রতীক। যে নবীর মাধ্যমে আমরা অন্ধকার থেকে আলোর পথ পেয়েছি, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন মুমিনের চারিত্রিক মাধুর্যের বহিঃপ্রকাশ।

দরুদে ইব্রাহিম – সহীহ আরবি মূল পাঠ

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَজِيدٌ.

দরুদে ইব্রাহিম আরবি উচ্চারণ 

দরুদে ইব্রাহিমের ইংরেজি ফনেটিক বা আরবি মাখরাজ অনুযায়ী উচ্চারণ নিচে দেওয়া হলো:

Allahumma salli ‘ala Muhammadin wa ‘ala ali Muhammad, kama sallayta ‘ala Ibrahima wa ‘ala ali Ibrahima innaka Hamidun Majid. Allahumma barik ‘ala Muhammadin wa ‘ala ali Muhammad, kama barakta ‘ala Ibrahima wa ‘ala ali Ibrahima innaka Hamidun Majid.

 দরুদে ইব্রাহিম বাংলা অর্থ

উচ্চারণের নিয়ম ও সাধারণ ভুল: দরুদ পাঠের সময় আরবি বর্ণগুলোর সঠিক মাখরাজ বজায় রাখা জরুরি। যেমন ‘সা’ (ص) এবং ‘সিন’ (س) এর পার্থক্য বুঝতে হবে। অনেকে ‘হামিদুন’ (حَمِيدٌ) পড়ার সময় ‘হা’ বর্ণটি হলকের শুরু থেকে উচ্চারণ করেন না, যা ভুল। আবার ‘মাজিদ’ পড়ার সময় ‘জিম’ বর্ণটিকে শক্ত করে উচ্চারণ করতে হবে। ‘আলি মুহাম্মদ’ পড়ার সময় ‘আলি’ (آلِ) এর ‘আ’ বর্ণটি এক আলিফ টানতে হবে। সাধারণ একটি ভুল হলো ‘বারাক্তা’ শব্দে ‘ক্বাফ’ (ق) এবং ‘কাফ’ (ك) এর গুলিয়ে ফেলা। শুদ্ধভাবে পড়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ আলেম বা ক্বারীর কাছ থেকে মাখরাজ শুনে নেওয়া উত্তম। কারণ ভুল উচ্চারণে শব্দের অর্থ বিকৃত হতে পারে, যা ইবাদতের মাধুর্য নষ্ট করে।

 দরুদে ইব্রাহিম বাংলা উচ্চারণ 

যারা আরবি পড়তে পারেন না, তাদের জন্য বাংলা উচ্চারণ নিচে দেওয়া হলো:

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া আলা আলি মুহাম্মদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া আলা আলি মুহাম্মদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।

নতুনদের জন্য নির্দেশনা: বাংলা হরফে আরবির হুবহু ধ্বনি ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। তাই পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, বাংলা উচ্চারণ পড়ার সময় কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। যেমন ‘মুহাম্মাদিঁও’ পড়ার সময় গুন্নাহর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ‘ইন্নাকা’ শব্দের ‘নুনে’ তাসদিদ থাকায় গুন্নাহ করতে হবে।

‘ইব্রাহিমা’ শব্দের ‘বা’ বর্ণে কলকলা বা ধাক্কা দিয়ে উচ্চারণ করতে হবে। নতুন যারা শিখছেন, তারা অডিও বা ইউটিউবে সহীহ তেলাওয়াত শুনে এই বাংলা বানানের সাথে মিলিয়ে চর্চা করলে দ্রুত আয়ত্ত করতে পারবেন। মনে রাখবেন, বাংলা বানানটি কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সহীহ আরবি মাখরাজ অনুসরণ করা। এটি আত্মস্থ করতে পারলে নামাজের একাগ্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

দরুদে ইব্রাহিম বাংলা অর্থ 

লাইনভিত্তিক অর্থ:

১. “হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত নাযিল করুন।”

২. “যেমন আপনি রহমত নাযিল করেছেন ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর।”

৩. “নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত এবং অতি সম্মানিত।”

৪. “হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর বরকত নাযিল করুন।”

৫. “যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছেন ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর।”

৬. “নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত এবং অতি সম্মানিত।”

গুরুত্বপূর্ণ শব্দের ব্যাখ্যা:

এখানে ‘اللَّهُمَّ’ (আল্লাহুম্মা) অর্থ ‘হে আল্লাহ’, যা অত্যন্ত বিনীতভাবে ডাকা। ‘صَلِّ’ (সাল্লি) অর্থ বিশেষ রহমত বা করুণা। ‘আলি মুহাম্মদ’ বলতে নবীর পরিবার ও অনুসারীদের বোঝানো হয়েছে। ‘بَارَكْتَ’ (বারাকতা) অর্থ হলো কোনো নেয়ামত বা কল্যাণকে স্থায়ী ও বৃদ্ধি করা। ‘হামিদুন’ অর্থ যিনি সর্বদা প্রশংসিত এবং ‘মাজিদুন’ অর্থ যার শান বা মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।

এই দোয়ার মাধ্যমে আমরা স্বীকার করছি যে, আল্লাহই সকল রহমত ও বরকতের উৎস। আমরা নবীর জন্য যে দোয়া করছি, তার তুলনা দিচ্ছি ইব্রাহিম (আ.)-এর ওপর বর্ষিত নেয়ামতের সাথে, যা মূলত আল্লাহর পূর্ববর্তী নেয়ামতের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ স্মরণ করা। এই অর্থ হৃদয়ে ধারণ করে পাঠ করলে নামাজে এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

দরুদে ইব্রাহিমের পূর্ণ ব্যাখ্যা 

দরুদে ইব্রাহিমের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এটি কেবল কতগুলো শব্দের সংকলন নয়, বরং এটি উম্মতে মুহাম্মদীর পক্ষ থেকে নবী করীম (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। এখানে মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে ইব্রাহিম (আ.)-এর তুলনা দেওয়ার কারণ হলো, ইব্রাহিম (আ.) হলেন মুসলিম জাতির পিতা (মিল্লাতে ইব্রাহিম)। মহান আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর বংশধরদের পৃথিবীর ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা দান করেছিলেন। উম্মতে মুহাম্মদী চায়, তাদের প্রিয় নবীকেও যেন আল্লাহ সেই বিশেষ মর্যাদা ও বরকতে ভূষিত করেন। এটি মূলত আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ মানের রহমত চাওয়ার একটি বিনম্র পদ্ধতি।

এই দরুদে ‘আলি মুহাম্মদ’ বা নবীর পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, যারা নবীর পরিবার এবং তাঁর আদর্শের অনুসারী, তাদের প্রতিও ভালোবাসা রাখা ঈমানের দাবি। আধ্যাত্মিকভাবে দরুদ পাঠ করলে বান্দার নফস বা আত্মা পবিত্র হয়। যখন আমরা বলি ‘ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ’, তখন আমরা আল্লাহর বড়ত্ব ও প্রশংসার মাধ্যমে দোয়া শেষ করি। দোয়ার শুরুতে ও শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা দোয়া কবুলের অন্যতম আদব। দরুদে ইব্রাহিম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পূর্ববর্তী নবীদের অবদানকেও সম্মান করতে হবে। এটি ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতা যেখানে সত্যের পথের সকল পথিক একসূত্রে গাঁথা।

উম্মতের জন্য শিক্ষা হলো, দরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা আমাদের নবীর অভাব অনুভব করি এবং তাঁর আদর্শে জীবন গড়ার অনুপ্রেরণা পাই। রাসূল (সা.) আমাদের জন্য যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার প্রতিদান দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই আমরা মহান আল্লাহর কাছেই আরজি জানাই যেন তিনি তাঁর হাবিবকে আমাদের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দেন। এটি বান্দার বিনয় এবং নবীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক সেতুবন্ধন। নামাজের মতো শ্রেষ্ঠ ইবাদতে এই দরুদ পাঠের বিধান রাখা হয়েছে যাতে মুমিন বান্দা প্রতি ওয়াক্তে তার নবীর সাথে আধ্যাত্মিক সংযোগ রক্ষা করতে পারে।

 নামাজে দরুদে ইব্রাহিম পড়ার বিধান 

নামাজে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজে দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদ পড়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়, সেখানে দরুদ নেই। কিন্তু শেষ রাকাতে তাশাহহুদের পর দরুদ পাঠ করা সুন্নাহ। হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। যদি কেউ ভুলে নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদ না পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেলে, তবে তার নামাজ হয়ে যাবে, কিন্তু সে একটি বড় সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। তবে অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে, এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্ব রাখে।

তাশাহহুদ বা আত্তাহিইয়াতুর সাথে এর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাশাহহুদে আমরা আল্লাহর সান্নিধ্য ও নবীর প্রতি সালাম পেশ করি, আর দরুদে তাঁর জন্য আল্লাহর খাস রহমত প্রার্থনা করি। নামাজ কবুলের জন্য দরুদ একটি বড় উসিলা। বিশেষ করে শেষ বৈঠকে দোয়ার আগে দরুদ পাঠ করা সুন্নাহ, যা দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন নামাজে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করতে, তাই সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণের জন্য এটি পাঠ করা অপরিহার্য।

 দরুদে ইব্রাহিমের ফজিলত ও সওয়াব 

দরুদে ইব্রাহিমের ফজিলত ও সওয়াব সম্পর্কে অসংখ্য সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তায়ালা তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করেন।” এটি কোনো সাধারণ সওয়াব নয়, স্বয়ং রবের পক্ষ থেকে রহমত পাওয়া বান্দার জন্য সবচেয়ে বড় সফলতা। এছাড়াও দরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দার দশটি গোনাহ মাফ হয় এবং জান্নাতে তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করা হয়।

 দরুদে ইব্রাহিমের ফজিলত

কিয়ামতের দিন রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াতে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। কিয়ামতের কঠিন বিপদে রাসূল (সা.)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভের সবচেয়ে সহজ পথ হলো বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। দুনিয়াবী জীবনেও দরুদের অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি দুশ্চিন্তা দূর করে, হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং রিজিকের বরকত বৃদ্ধি করে।

 এক হাদিসে এসেছে, জনৈক সাহাবী যখন রাসূল (সা.)-কে বললেন তিনি তাঁর সব জিকিরের সময় কেবল দরুদ পড়বেন, তখন নবীজী (সা.) বললেন, “তাহলে তোমার যাবতীয় দুশ্চিন্তার জন্য এটিই যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপ ক্ষমা করা হবে।” দরুদ পাঠের মাধ্যমে মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জিত হয় এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এটি পরকালের মিযানে নেকির পাল্লাকে ভারী করবে।

দরুদে ইব্রাহিম কোন কোন সময় পড়া উত্তম

যদিও দরুদে ইব্রাহিম যেকোনো সময় পাঠ করা সওয়াবের কাজ, তবে কিছু নির্দিষ্ট সময় রয়েছে যখন দরুদ পাঠের ফজিলত আরও বেশি হয়ে যায়। এসব সময়ে দরুদ পাঠ করলে অধিক সওয়াব ও বরকত লাভ হয়।

  • নামাজের শেষ বৈঠক (আবশ্যিক):
    প্রতিটি ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
  • জুমার দিন ও রাত:
    জুমার দিনে ও রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এই সময় দরুদ পাঠ করলে তা সরাসরি রাসূল (সা.)-এর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
  • আযান শোনার পর:
    আযানের জবাব দেওয়ার পর রাসূল (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা সুন্নাত। এরপর দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • দোয়ার শুরুতে ও শেষে:
    যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ দোয়া করার আগে ও শেষে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করলে সেই দোয়া অধিক গ্রহণযোগ্য হয়।
  • নবী (সা.)-এর নাম শোনার পর:
    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে বা শোনা গেলে দরুদ পাঠ করা মুস্তাহাব এবং অনেক আলেমের মতে অত্যন্ত জোরালো সুন্নাত।

দরুদ পাঠের আদব ও নিয়ম 

দরুদ পাঠ একটি ইবাদত, তাই এর কিছু নির্দিষ্ট আদব ও নিয়ম রয়েছে। 

প্রথমত, দরুদ পড়ার সময় অন্তর পবিত্র রাখা এবং রাসূল (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম মহব্বত বা ভালোবাসা অন্তরে পোষণ করা জরুরি। 

দ্বিতীয়ত, দরুদ পাঠের সময় তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা উচিত। ওজু অবস্থায় দরুদ পাঠ করা অধিকতর উত্তম ও সওয়াবের কাজ, তবে ওজু ছাড়াও দরুদ পাঠ করা জায়েজ।

বসার ভঙ্গি হবে বিনম্র। কিবলার দিকে মুখ করে বসা দরুদ পাঠের অন্যতম আদব। দরুদ পাঠের সময় মনকে এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত না করে রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারক বা তাঁর আদর্শের কথা চিন্তা করা যেতে পারে। দরুদ পাঠের পর চোখের পানি ফেলে দোয়া করা দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। রাসূল (সা.)-এর নাম শোনার পর ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। আর নামাজের বাইরে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা একটি অত্যন্ত উঁচু মানের নফল ইবাদত, যা জুমার দিনে ১০০ বার বা তার বেশি পড়ার বিশেষ তাকিদ রয়েছে।

দরুদে ইব্রাহিম শেখার সহজ পদ্ধতি

দরুদে ইব্রাহিম শুদ্ধভাবে মুখস্থ করা ও নিয়মিত পাঠ করার জন্য কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে:

  • খণ্ড খণ্ড করে মুখস্থ করা:
    প্রথমে দরুদের প্রথম অংশ (“আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদ…”) মুখস্থ করুন। এরপর দ্বিতীয় অংশ (“আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ…”) আলাদা করে মুখস্থ করুন।
  • অডিও শুনে অনুশীলন করা:
    নির্ভরযোগ্য ক্বারী বা আলেমের শুদ্ধ উচ্চারণে দরুদ পাঠের অডিও বারবার শুনলে উচ্চারণ ও ছন্দ সহজে আয়ত্তে আসে।
  • অর্থ বুঝে পড়া:
    বাংলা অর্থ বুঝে দরুদ পাঠ করলে তা শুধু মুখস্থ নয়, বরং হৃদয় থেকে পড়া সম্ভব হয় এবং আমলের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

নিয়মিত এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে যে কেউ সহজেই দরুদে ইব্রাহিম শিখে নিতে পারে এবং নামাজ ও দোয়ায় তা সঠিকভাবে পাঠ করতে পারে।

নামাজে দরুদে ইব্রাহিমের অবস্থান

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজসহ ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল নামাজ—সব ক্ষেত্রেই দরুদে ইব্রাহিমের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নামাজের একটি অপরিহার্য সুন্নাহ অংশ, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে নিয়মিত আদায় করতেন এবং সাহাবিদেরও শিক্ষা দিয়েছেন।

নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করার মাধ্যমে নামাজ পরিপূর্ণতা লাভ করে। বিশেষ করে ফরজ নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে দরুদ ছেড়ে দিলে নামাজের সৌন্দর্য ও সুন্নাহর পূর্ণতা নষ্ট হয়।

তাশাহুদের পর পাঠের নিয়ম

নামাজে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

  • প্রথমে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পাঠ করতে হয়।
  • এরপর পূর্ণ মনোযোগ ও খুশুর সঙ্গে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করতে হয়।
  • দরুদে ইব্রাহিমের পর যেকোনো মাসনূন দোয়া পাঠ করা উত্তম।
  • সবশেষে ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়।

এই নিয়ম অনুসরণ করলে নামাজ সুন্নাহ অনুযায়ী পরিপূর্ণ হয়।

ইমামের পেছনে জাহরী নামাজে পড়তে হয় কিনা

যখন কোনো মুসল্লি ইমামের পেছনে জাহরী (সশব্দে ক্বিরাত সহকারে) নামাজ আদায় করেন, তখনও শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর তিনি নিরবে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করবেন।

ইমামের পেছনে নামাজ আদায়রত মুক্তাদিদের জন্য এই সময় চুপ থাকা বা দরুদ না পড়ার কোনো বিধান নেই। বরং প্রত্যেক মুসল্লি নিজ নিজ নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করবেন—এটাই সঠিক ও গ্রহণযোগ্য আমল।

দুঃসময় ও বিপদে দরুদ পাঠের উপকারিতা

ইসলামে দুঃসময়, বিপদ, মানসিক অস্থিরতা কিংবা কোনো কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হলে আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এ সময় দোয়ার আগে ও পরে দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। হাদিসে বর্ণিত আছে, দরুদ পাঠের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমতের আরও নিকটবর্তী হয় এবং তার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

দরুদ পাঠ

দরুদে ইব্রাহিম মূলত আল্লাহর প্রশংসা এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রকাশ। যখন কোনো ব্যক্তি বিপদের মুহূর্তে দরুদ পাঠ করে দোয়া করে, তখন সে নিজের চাওয়ার আগে আল্লাহর প্রিয় রাসূল (সা.)-এর সম্মানকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে আল্লাহ তাআলা সেই বান্দার ওপর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষণ করেন।

অনেক আলেমের মতে, দোয়া দরুদ ছাড়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলে থাকে। দরুদ পাঠ সেই দোয়াকে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই দুঃসময়, রোগ-ব্যাধি, ঋণ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা যেকোনো বিপদে নিয়মিত দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত উপকারী আমল।

দরুদে ইব্রাহিম নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা 

আমাদের সমাজে দরুদে ইব্রাহিম নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, দরুদে ইব্রাহিম কেবল নামাজের মধ্যেই পড়া যায়, নামাজের বাইরে এটি পাঠ করা যাবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। নামাজের বাইরেও এই দরুদটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দরুদ হিসেবে গণ্য এবং তা পাঠ করা যায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দরুদ পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা (যেমন সোয়া লাখ বার) পূর্ণ না করলে সওয়াব পাওয়া যাবে না। আসলে দরুদ আপনি একবার পড়লেও তার সওয়াব পাবেন।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, দরুদ কেবল আরিতেই পড়তে হবে, অর্থ না বুঝলে সওয়াব হবে না। যদিও আরবি পাঠের সওয়াব স্বতন্ত্র, তবে অর্থ বুঝে পড়লে এর আধ্যাত্মিক প্রভাব বেশি হয়। অনেকে মনে করেন, দরুদ পড়ার সময় নবীর নাম এলে বৃদ্ধাঙ্গুলি চুলে মুছে চোখে লাগানো জরুরি বা সুন্নাত। এটি কোনো সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। দরুদ পাঠের মূল উদ্দেশ্য হলো নবীর প্রতি দোয়া ও ভালোবাসা প্রকাশ, কোনো লৌকিকতা বা ভিত্তিহীন প্রথা পালন নয়। সহীহ সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে এসব ভুল থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।

শেষ কথা

দরুদে ইব্রাহিম মুমিন বান্দার জন্য মহান রবের পক্ষ থেকে এক অমূল্য নেয়ামত। এটি রাসূল (সা.)-এর সাথে উম্মতের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। নামাজের মতো পবিত্র ইবাদতে এর অন্তর্ভুক্তি এর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে আল্লাহর প্রশংসা এবং নবীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা। নিয়মিত দরুদ পাঠের মাধ্যমে আমরা কেবল পরকালীন পুরস্কারই লাভ করি না, বরং দুনিয়ার জীবনেও পাই মানসিক প্রশান্তি ও আল্লাহর বিশেষ রহমত। তাই আসুন, আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জিকিরের তালিকায় দরুদে ইব্রাহিমকে প্রাধান্য দিই এবং শুদ্ধ উচ্চারণে ও অর্থ বুঝে এই শ্রেষ্ঠ দরুদটি পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলি।

দরুদে ইব্রাহিম সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর

১. দরুদে ইব্রাহিম কি নামাজের বাইরে পড়া যায়?

হ্যাঁ, এটি শ্রেষ্ঠ দরুদ এবং নামাজের বাইরেও যেকোনো সময় পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

২. নামাজে দরুদ না পড়লে কি নামাজ হবে?

ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে নামাজ অপূর্ণ থাকবে। ভুলবশত শেষ বৈঠকে ছেড়ে দিলে হানাফী মতে নামাজ হয়ে যাবে কিন্তু বড় সুন্নাহ বর্জিত হবে। অনেক ইমামের মতে এটি বাধ্যতামূলক।

৩. দরুদ পড়ার জন্য কি ওজু জরুরি?

না, ওজু ছাড়াই দরুদ পাঠ করা জায়েজ। তবে ওজু সহকারে পড়া অধিকতর সওয়াব ও আদবের অন্তর্ভুক্ত।

৪. জুমার দিনে দরুদ পাঠের বিশেষ কোনো নিয়ম আছে?

জুমার দিনে আসর নামাজের পর বা যেকোনো সময় বেশি বেশি দরুদ পাঠের কথা হাদিসে আছে। দরুদে ইব্রাহিম পড়া সবচেয়ে উত্তম।

৫. কিয়ামতের দিন দরুদ পাঠকারী কীভাবে উপকৃত হবে?

সে রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবে এবং তাঁর বিশেষ শাফায়াত বা সুপারিশ লাভ করবে।

৬. দরুদ পড়ার সময় কি মাথা ঢাকতে হবে?

মাথা ঢাকা একটি ইসলামি আদব, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। মাথা না ঢেকেও দরুদ পড়া যায়।

৭. দরুদ পাঠের সংক্ষিপ্ততম রূপ কী?

রাসূল (সা.)-এর নাম শুনলে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলা।

৮. দুনিয়ার বিপদ থেকে বাঁচতে দরুদ কি সাহায্য করে?

হ্যাঁ, হাদিস অনুযায়ী দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ দুশ্চিন্তা ও বিপদ দূর করে দেন এবং রিজিকে বরকত দান করেন।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

As you found this post useful...

Follow us on social media!

We are sorry that this post was not useful for you!

Let us improve this post!

Tell us how we can improve this post?

Leave a Comment